ঈশ্বর বিশ্বাসের মাত্রা অনুযায়ী রিচার্ড ডকিন্স সকল মানুষকে একটা প্রবাবিলিটি স্পেকট্রামে সাজিয়েছিলেন। কঠোর ভাবে আস্তিক হওয়া থেকে কঠোর নাস্তিক পর্যন্ত বিস্তৃত এই ডকিন্স স্কেলের যে পয়েন্টেই আপনি থাকুন না কেন, বাঙালি প্রজাতির পেটুক বর্গের মানুষ হলে ঈশ্বরের সামনে আপনাকে দাঁড়াতেই হবে- পুজোর ভোগের লাইনে। সেই ভোগের খিচুড়িতে ফিলসফি, থিওলজি, রাজনীতি, বিজ্ঞান চেতনা, সব ঘেঁটে একাকার হয়ে যায় ; পাতে লেগে থাকে শুধু ঘিয়ের গন্ধ।

সূত্রঃ গুগল

আরাধ্য দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা অন্নই হলো নৈবেদ্য। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের ঈশ্বর চেতনায় খাবারের জায়গা খুবই প্রাচীন, ভীষণ ফান্ডামেন্টাল। সেই বিশ্বাসের জোরে ঘরে ঘরে ক্ষুদার্থের মুখে ভাত যোগান দেবী অন্নপূর্ণা ; নতমস্তকে গৃহবধূ প্রার্থনা করে- “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে “। বাইবেলের গসপেলে রুটি হয়ে ওঠে যিশুখ্রীষ্টের দেহের অংশ, কয়েক টুকরো রুটি আর মাছ দিয়ে তিনি হাজার অভুক্তের ক্ষিদে মেটান। ঈদের কুরবানির মাংস সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে সৌহার্দ্যের দেওয়া নেওয়া হয়ে যায়।

সূত্রঃ গুগল

পল্লী বাংলার অনাড়ম্বর জীবনে নৈবেদ্য বা ভোগের ধারণাও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। সন্ধ্যাবেলায় শাঁকে ফু দেওয়ার পর হাতে পাওয়া মিছরি, নকুলদানা থেকে শুরু করে কুড়িয়ে নেওয়া হরিরলুটের বাতাসা; কিংবা চৈত্র মাসে হরিনামের শেষে পাত পেড়ে খাওয়া খিচুড়ি – এসব বাংলার লোকাচারেরই অবিচ্ছেদ্য প্রথা। গ্রামবাংলার নৈবেদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বকীয়তা। সেখানে গৃহস্থ তার বাড়ির প্রিয়তম সদস্যের মতোই গৃহদেবতাকে সবার আগে অন্ন নিবেদন করে তারপর নিজের অন্নজলের ব্যবস্থা করে। সেই গৃহদেবতা কখনো সন্তান-স্নেহের প্রাপক গোপাল, কখনো ‘মা’ কালী। পল্লী লোকসংস্কৃতির দেবদেবীর জন্ম সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন থেকে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা যাবতীয় বিপদ আপদ- বাঘ বা সাপের উৎপাত, কলেরা, বসন্তের প্রাদুর্ভাব ইত্যাদি থেকে রক্ষা করাই সেই দৈব শক্তির উদ্দেশ্য। গুরুগম্ভীর আধ্যাত্মিক আলোচনার অবকাশ সেই জীবনযাত্রায় খুবই কম। গালভারী মন্ত্রের চেয়ে সহজ সরল ছন্দের পাঁচালীই তাদের আরাধনার সম্বল। সেই ঈশ্বরকে নিবেদন করা ভোগও অনাড়ম্বর, জাঁকজমকহীন। রোজকার সহজলভ্য খাদ্যশস্য, শাকসব্জী, ফলমূলই দেবতার নৈবেদ্যর উপাদান। আস্তিক গৃহীর নিজের বিশ্বাসের মতই তার ভোগও অনেকটাই নিজস্ব, ব্যক্তিগত।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

কিন্তু ভোগের ধারণা ঠিক যতটা ব্যক্তিগত, ততটাই সার্বজনীনও। সন্ধ্যারতির পর ঠাকুরঘরের বাতাসার টুকরো সবার মধ্যে ভাগ না করে নিলে কিছু একটা যেন বাকী থেকে যায়। সন্ধ্যায় চণ্ডীমণ্ডপে নাম সংকীর্তন শুনতে আসা গোটা গ্রামের মানুষ পাশাপাশি বসে প্রসাদ খেয়ে ঘরে ফেরে। এপার বাংলার রান্নাপুজোয় দেবী মনসার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করার পর বাড়ির সদস্যরা এবং নিমন্ত্রিত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনরা পান্তাভাত সহযোগে ইলিশমাছ ভাজা খায় উৎসবের মেজাজে। আদিম যুগে প্রতিটি গোষ্ঠীর মানুষ সারাদিনের শিকারের পর আগুনের চারপাশে বসে অজ্ঞেয়, অবোধ্য কোনো এক শক্তিকে সেই খাবার উৎসর্গ করে, তা নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিতো। খাবার, (বিশেষত উৎসর্গীকৃত খাবার বা ভোগ) আর জ্ঞাতিভাবের এই সম্পর্ক তাই ভীষণই প্রাইমাল। আজকের দিনে নাস্তিক মানুষও তাই ধর্মবিশ্বাসের মতানৈক্য দূরে রেখে তার ঈশ্বরবিশ্বাসী প্রতিবেশীর সাথে নৈবেদ্য ভাগ করে নিতে খুব একটা দ্বিধা বোধ করে না।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে নৈবেদ্যর অপশন প্রচুর থাকলেও ভোগ হিসেবে খিচুড়ির অ্যাপিল চিরন্তন, প্রশ্নাতীত। খিচুড়ির মুখ্য উপাদান, অর্থাৎ চাল আর ডাল বাংলার দুটি স্টেপল ক্রপ। মশলাপাতিও অত্যন্ত সহজলভ্য। চাল, ডাল, ঘি, মশলার এই সিম্ফনিতে সঙ্গত করে লাবড়া- সেটাও তৈরী হয় আঞ্চলিক শাকসব্জী দিয়ে। তবে খিচুড়ির রেসিপি ডিকনস্ট্রাকশন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তার জন্য বরং বন্ধুবর ডাঃ উৎসব গাঙ্গুলির লেখা পড়ে দেখতে পারেন; এক্স-রে’র মত তীক্ষ্ণ নীরীক্ষণে রন্ধনশৈলীর ডিসেকশন যদি পড়তে চান, হি ইজ ইয়োর কাপ অফ টি।
আমি বরং ফোকাস করি খিচুড়ির সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট’এ। আদতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন আর ফ্যাটের একটা আনসফিস্টিকেটেড কম্বিনেশন কীভাবে হাজারো সুস্বাদু, সুদৃশ্য রেসিপিকে পিছনে ফেলে বাঙালী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে; হোয়াট মেকস্ খিচুড়ি সো স্পেশাল? কিন্তু সেই অজানা উপাদানের সন্ধান পেতে গেলে আমাদের ভিসুয়াল ফিল্ডের পরিধি আরও কিছুটা বাড়াতে হবে। খিচুড়ি সাংঘাতিকভাবে উপলক্ষভিত্তিক একটি খাবার। বর্ষাকালে ইলিশ মাছ ভাজার সাথে খিচুড়ি, প্রবাসে হাত পুড়িয়ে রান্না শেখার খিচুড়ি কিংবা পুজোবাড়ির সপ্তমীর ভোগের খিচুড়ি, এদের রন্ধনপ্রণালীগত মিল থাকলেও প্রতিটি নিজস্ব ডোমেনের অধিকারি। প্রত্যেকের ফ্যানবেসও নিজের পছন্দসই খিচুড়ির ব্যাপারে ভীষণভাবে খুঁতখুঁতে। কে জানে, হয়তো অকেশান বদলানোর সাথে সাথেই খিচুড়ির স্বাদ বদল হয়।

উপরের ছবি আর ফিচারড ছবিটি তুলেছেন ডাঃ উৎসব গাঙ্গুলি

আমার পছন্দের খিচুড়ির কথা বলতে গেলেই মনে পড়ে স্কুলে সরস্বতী পুজোর ভোগে বেগুনি আর লাবড়া সহযোগে খিচুড়ির কথা। ঐ যে বলছিলাম, চন্ডীমন্ডপে গোটা গ্রামের এক জায়গায় এসে খিচুড়ি বানানো আর খাওয়ার কথা, মেট্রোপলিটন কালচারে সেটা প্রায় লোপ পেয়েছে। এখনো পুজো হয় আর ভোগ নিবেদন করা হয়, কিন্তু সেই প্র‍্যাক্টিসে ঢুকে গেছে প্রাচুর্যের রোশনাই। নিজেরাই হাত লাগিয়ে চাল,ডাল,মাচার লাউ-কুমড়ো জোগাড় করার দিন আজ আর নেই। রান্না এবং পরিবেশন করার জন্য রয়েছে কেটারিং সার্ভিস। আছে বিলাসবহুল মেনু। অ্যাপার্টমেন্টের সদস্যরা এসে সেলফি তুলেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যান। গোটা কমিউনিটি একসাথে এসে কাজ করে নৈবেদ্য ভাগ করে নেওয়ার প্র‍্যাক্টিস কিছুটা হলেও বেঁচে আছে শুধু স্কুল গুলোয়।
ছোটোবেলায় বসন্ত শুরু হতো সেদিনই, সরস্বতী পুজোর কয়েকদিন আগে যখন ভ্যানে করে চাল-ডাল-তেল-মশলা-সব্জী ঢুকতো স্কুলের স্টোরেজে। পুজোর সরঞ্জাম, ডেকরেশনের রঙিন কাগজ, থার্মোকল, সব কিনে আনতো হায়ার সেকেন্ডারির দাদা দিদিরা, স্যারেদের তত্বাবধানে। রান্নার কাজ করতো ক্যান্টিনের সমস্ত স্টাফ, পুজোর সব কাজ ছাত্র ছাত্রীদের। পুজোর দিন পরিবেশনের কাজ করতেন স্যারেরা। সবচেয়ে বদরাগী অঙ্ক স্যারও সেইদিন সবার পাতে জোরকরে এক্সট্রা বেগুনি তুলে দিয়ে বলতেন “খা বলছি, চুপচাপ খা, নইলে মার খাবি।”
ঐ বয়সে ভালোলাগাগুলো সযত্নে লালিত করার উপায় জানা ছিলো না কারোরই। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে ডিনার ডেটে যাওয়ার উপায়, সামর্থ বা ম্যাচিওরিটি- কোনোটাই তৈরি হয়নি তখনও। কিন্তু শালপাতার থালায় সমস্ত বন্ধুর মাঝেও সেই বিশেষ মানুষের কাছাকাছি বসে আঙুলে লেগে থাকা খিচুড়ির স্বাদ চেটেপুটে নেওয়াও কিছু কম ভালোবাসার দাবিদার ছিলো না। আমার খিচুড়ির সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট তাই সেই দিন গুলো আর চারপাশের প্রাণচঞ্চল মানুষগুলো। সেই ভোগের স্বাদ ফিরে পাওয়া আর বোধহয় সম্ভব হবে না।
কি বলে শুরু করেছিলাম? নাস্তিককেও ভগবানের সামনে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু কে সেই ঈশ্বর, কোথায় আছেন তিনি? তিনি কি মন্দিরের ভেতরে পূজিত হন? নাকি তিনি থাকেন চণ্ডীমণ্ডপের দালানে পাশাপাশি বসে থাকা মানুষের শালপাতায়? যার রহস্যময় অঙ্গুলিহেলনে নিতান্ত আনগ্ল্যামারাস চাল ডালের মিশ্রণ জীবনের সাথে জীবনকে মুক্তোর মালার মতো জুড়ে গোটা সমাজকে এক ছাতার তলায় এনে দাঁড় করায়?
আপনার খিচুড়ির সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট কী? অবশ্যই জানাবেন। ভালো থাকবেন।

শুভ বসন্ত পঞ্চমী।